Uncategorized
পুরনো অ্যালবামের পাতায়

স্মৃতির ডায়রি
মিজানুর রহমান
কত যতনে বাঁধা স্মৃতি, মায়ার অদৃশ্য আঁচলে,
গোপনে সুরভিত ছায়া, কিছু সময়ে সে জীবনে ফিরে আসে মৃদু স্বরে।
পুরনো অ্যালবামের পাতায়, জমে থাকা ছবি,
হাসি, চোখের জল—যা ছলিয়ে যায়, সময়ের গভীরে হারানো ধ্বনি।
ডায়রির পাতায় লেখা, না বলা শত কথা,
অথবা ভাঙ্গা কোন চিরন্তন স্বপ্নের চিহ্ন— যা হারিয়ে যায় সময়ের অন্ধকারে।
পুরনো স্মৃতি চাপা পড়ে সেলফের এক কোণে,
তবুও নয়ন মেললে, কোথাও কিছু দেখা যায় না, ভিড়ের মাঝে হারিয়ে যায়, শত ব্যস্ততার ভেতরে।
উদাস দিনের শেষ প্রহরে, যখন সময় থেমে যায়,
মনে পড়ে সে স্মৃতির ঝড়, এলোমেলো হয়ে ওঠে সব, যেন ঝরঝরে বাতাসে ভাসে।
হৃদয়ের গভীরে অশান্ত ঢেউ তোলে,
এভাবে হারানো মুহূর্তগুলো ফিরে আসে, জীবনানন্দ দাশের মতো— স্নিগ্ধ চেতনার মতন, শান্ত অন্ধকারে।
সময়ের বিস্ময়ে হারিয়ে যায় সমস্ত কিছু,
তবুও স্মৃতিগুলো—অভ্রান্ত, অগোচরে, মনের গভীরে থেকে যায় চিরকাল।
কবিতার মূলভাব
“স্মৃতির ডায়রি” কবিতাটি স্মৃতি ও অতীতের অনুভূতি নিয়ে লেখা। এখানে স্মৃতিকে একটি মায়াময় শক্তি হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে, যা আমাদের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
কবিতায় বলা হয়েছে, পুরনো অ্যালবামের ছবি, ডায়রির পাতায় লেখা না বলা কথা, ভাঙা স্বপ্ন—সবই সময়ের সঙ্গে চাপা পড়ে যায়। ব্যস্ত জীবনের ভিড়ে তারা হারিয়ে যায়। কিন্তু, যখন দিন শেষে একটুখানি নির্জনতায় সময় থেমে যায়, তখন সেই হারানো স্মৃতিগুলো মনের আকাশে ঝড়ের মতো ফিরে আসে।
এই স্মৃতিগুলো কখনও হাসায়, কখনও কাঁদায়, কখনও বা স্নিগ্ধ ও গভীর অনুভূতি জাগায়। সময় সবকিছু নিয়ে যায়, কিন্তু স্মৃতিগুলো হৃদয়ে চিরকাল থেকে যায়। তারা হারিয়ে গেলেও পুরোপুরি মুছে যায় না—অভ্রান্তভাবে, অগোচরে জীবনের অংশ হয়ে থাকে।
স্মৃতি শুধু অতীত নয়, তা বর্তমানের নিঃশব্দ সঙ্গী। এটি হৃদয়ের গভীরে জেগে থাকে, যেন এক অনন্ত বোধের সংগতি। ব্যস্ত জীবনের আড়ালে লুকানো এক কোমল অনুভব, যা সময়ের স্রোতে ভেসে গেলেও, রয়ে যায় অমলিন প্রেমের রূপ।
এই কবিতায় স্মৃতির অমরতা এবং হৃদয়ের নীরব ভাষা প্রতিফলিত হয়েছে। মূল বক্তব্য হলো—স্মৃতি কখনো হারায় না, তা আমাদের হৃদয়ে চিরকাল জীবিত থাকে।
🌻নব যুগের কাব্য🌻

Uncategorized
পৃথিবীর কোনো যন্ত্রণা তোমাকে ছুঁতে দিবোনা

ক্ষত
তামান্না রহমান
তুমি আমার আপন জন হতে চেয়েছিলে,
আমি বুকের ক্ষত দেখিয়ে বলেছিলাম
এখানে রাখার জায়গায় নেই,
যাকে রাখব সেই আমার ক্ষতে ক্ষতবিক্ষত হবে।
তুমি বলেছিলে একটু জায়গায় দিয়ে দেখ,
সব ক্ষত একদিন মুছে দিবো।
পৃথিবীর কোনো যন্ত্রণা তোমাকে ছুঁতে দিবোনা,
পরম চাদরে বুকের ভিতর আগলে রাখব।
বিশ্বাসের উপর ভর করে তোমাকে বিশ্বাস করে ছিলাম
ক্ষত জায়গায় তোমাকে বসালাম যাতে যন্ত্রণা গুলো কিছুটা হলেও হ্রাস পায়।
হাতটা শক্ত করে ধরে রাখার অঙ্গিকার করেছিলে,
কোনোদিন হাত দু’টো আলাদা হবে না।
আচমকা তুমি একদিন এসে বলে দিলে,
আমি তোমার যোগ্য নই,আমার থেকে উত্তম কিছু পাওয়ার যোগ্যতা রাখ তুমি।
সেদিন আমি খুব হেসেছিলাম জানো তো,
এই ভেবে যে পৃথিবীর এই নাট্যমঞ্চে সবাই খুব নিখুঁত অভিনয় করে।
শেষমেশ আমাকে ভেঙ্গে দিয়ে ভালো থাকো বলে ছেঁড়ে গেলে।
আমার ক্ষত সারানোর বদলে আরও ক্ষতবিক্ষত করে দিলে।
অতঃপর বুঝতে পারলাম কাউকে ক্ষত দেখাতে নেই,
নিজের ক্ষত নিজের কাছে পরম যত্নে লুকিয়ে রাখতে হয়।
কবিতার মূলভাব:
এই কবিতায় একটি সম্পর্কের ভাঙন এবং ব্যক্তিগত যন্ত্রণার গভীর বর্ণনা করা হয়েছে। কবি নিজের ক্ষত অন্যের কাছে দেখানোর পর যে আরও গভীর ক্ষত সৃষ্টি হতে পারে, তা তুলে ধরেছেন। এখানে বিশ্বাস, ভালোবাসা, প্রতিশ্রুতি, এবং যন্ত্রণার এক জটিল চক্র প্রকাশিত হয়েছে। কবি মনে করেন, নিজের ক্ষত অন্যদের সামনে তুলে ধরা কখনোই সঠিক নয়। বরং, তা নিজেদের মধ্যে ধারণ করে, পরম যত্নে সেই ক্ষত সারানোর চেষ্টা করা উচিত।
কবিতাটি আমাদের শেখায় যে, সম্পর্কের মধ্যে আস্থা থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় সেই আস্থা ভেঙে যায়। আর এই ভাঙনের মধ্যে এক ধরনের অসহ্য যন্ত্রণা থাকে, যা শুধুমাত্র নিজের মধ্যে লুকিয়ে রাখা উচিত। অন্যদের কাছে নিজেদের কষ্ট তুলে ধরলে, সেটা শুধু বাড়তে পারে, কখনো কখনো সেই কষ্ট আরও বেড়ে যায়।
এখানে কবি বর্ণনা করেছেন যে, সম্পর্কের মধ্যে বিশাল ভালোবাসা এবং বিশ্বাস থাকার পরও, কখনো কখনো সেই সম্পর্কের ভাঙন ঘটতে পারে। তাই, নিজের ক্ষতগুলোকে লুকিয়ে রেখে, নিজেই সেগুলোর সারানোর চেষ্টা করা সবচেয়ে ভালো।
এই কবিতাটি আমাদের শিখিয়ে দেয় যে, সম্পর্কের মধ্যে আস্থার জায়গায় কোনো ভুল ধারণা বা ত্রুটি আসলে, সেটা শুধু ব্যক্তিগতভাবে মোকাবিলা করা উচিত। অন্যদের কাছে নিজের কষ্ট প্রকাশ করা, কখনো কখনো আরও যন্ত্রণার সৃষ্টি করে।
Uncategorized
এই আষাঢ়ে তুমি এসো

এই আষাঢ়ে তুমি এসো
তামান্না রহমান
এই বর্ষার প্রভাতে একগুচ্ছ কদম আনো,
রিমঝিম বৃষ্টিধারায় খোঁপায় গাঁথি সে ফুল,
নয়নে আঁকি কৃষ্ণকলি কাজলের ছায়াপথ,
পদতলে আলতার রেখায় আঁকি রাঙা ভুল।
আমি সাজি ধরণীর কন্যা, নিরাভরণ,
শস্যখেতের পাখির কলতানে হৃদয় মরমর।
তুমি এসো, দক্ষিণ হাওয়ার বুকে ভাসি শাপলা তুলে,
ভাঁওয়াল গানের সুরে আমার প্রাণে দাও গরিমা।
তুমি এসো প্রেমের মধুময় ক্ষণে,
নীরব কথার অন্তরালে গড়ে তুলি স্মরণ।
ভালোবাসার রসে আমায় করো স্নান,
রুক্ষ জগতের ছায়ায় তুমি হও প্রণয়-আলয়ন।
ঢেঁকিছাটা ধানের গন্ধে রাঁধি পাটিসাপটা পিঠে,
টিনের চালায় বৃষ্টিস্বর ছন্দে করি তোমায় নিদ্রিত।
তোমার হাত ধরে পথ চলি জলে,
এই আষাঢ়ে, প্রেমহয়ে তুমি এসো বরণে।
মূলভাব:
এই কবিতায় বর্ষার প্রথম প্রভাতে প্রেমিকা তার প্রিয়জনকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন, যেন তিনি তার জীবনে প্রেম এবং সুখ নিয়ে আসেন। কবি বর্ষার রিমঝিম বৃষ্টিতে কদম ফুল গাঁথার কথা বলেন, যা ভালোবাসার সূচনা এবং নতুন জীবনের প্রতীক। তিনি তার জীবনের সুন্দর মুহূর্তগুলোকে স্মরণ করতে চান, যেন প্রেমের মাধ্যমে সেই মুহূর্তগুলো আরও মধুর হয়ে ওঠে।
কবিতায় ধরণীর কন্যা হিসেবে কবি নিজেকে সাজান, যেখানে তিনি শস্যখেতের পাখির কলতানে প্রাণিত হন। এই অভিব্যক্তি প্রেমের একটি নিরাভরণ এবং প্রাকৃতিক সুন্দরতার প্রতীক। তিনি তার প্রিয়জনকে দক্ষিণ হাওয়ার বুকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন, যেন প্রেমের সুরে তার প্রাণকে উজ্জীবিত করা হয়। কবি তাঁর প্রেমিকের কাছে অপেক্ষা করছেন, যাতে একসাথে প্রেম এবং প্রকৃতির মিলনে নতুন এক জগত সৃষ্টি করা যায়।
কবিতার শেষ অংশে, কবি প্রেমের মধুময় মুহূর্তে তার প্রিয়জনের সাথে কাটানোর আশা ব্যক্ত করেন, যেখানে তারা একসাথে ধানের গন্ধে পাটিসাপটা পিঠে তৈরি করবেন এবং বৃষ্টির ছন্দে একে অপরকে অনুভব করবেন। এটি একটি প্রেমময় এবং স্বপ্নময় দৃশ্য, যা বর্ষার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং প্রেমের সংমিশ্রণকে চিত্রিত করে।
এছাড়া, কবি স্বপ্ন দেখে, যখন তারা একসাথে বর্ষার মধ্যে নতুন জীবনের শুরু করবেন, তখন তাদের সম্পর্ক হবে আরও গভীর। তাদের জীবন হবে মধুর, যেখানে প্রেম এবং প্রকৃতি একে অপরকে পূর্ণ করবে। কবি মনে করেন, এই প্রেমের মধ্যে একটি অপূর্ব শক্তি এবং ঐক্য রয়েছে, যা জীবনের সব বাধাকে জয় করে।
এই কবিতার মাধ্যমে প্রেম, প্রকৃতি, এবং একে অপরের প্রতি গভীর অনুভূতির মিলনে একটি অনন্য সম্পর্কের চিত্র আঁকা হয়েছে। এতে বর্ষার সৌন্দর্য, প্রেমের সুর, এবং প্রকৃতির নীরব ভাষা মিলিয়ে একটি হারানো পৃথিবীর স্মৃতি সৃষ্টি করা হয়েছে।
Uncategorized
জীবন তো হতে পারত দ্বিপ্তময়

“তুমি চুপ ছিলে”
আন্না রহমান
জীবন তো হতে পারত দীপ্তিময়,
তবু আমরা ঘর বাঁধলাম ভাঙনের কূলে,
খরস্রোতা নদী জানে না স্নেহ,
সে শুধু ভাঙে—কোনো প্রশ্ন ছাড়াই, নীরব ছলে।
আমাদের প্রথম পরিচয়েই ছিল ছায়া,
শুরুর ক্লান্তি যে ভবিষ্যতের রক্তক্ষয়—
যে প্রেমের ভিতর বিষ ঢুকে পড়ে শুরুতেই,
তার মধু আসে না আর, আসে কেবল ক্ষয়।
প্রেম তো সে বৃক্ষ,
যার মূল শক্ত হয় বিশ্বাসে—
তোমার নীরবতা সে মূলে পচন ধরায়,
যেখানে রক্ষা ছিলো আমার সম্মানে।
তুমি চুপ ছিলে—
যখন আমার দিকে তির ছুটে এল পরিচিত মুখে,
তুমি চুপ ছিলে—
যখন আমার চোখের জল ছুঁয়ে গেল তোমার নীরব বুকে।
যারা বিষ ছড়ালো, তারা তো মুক্ত,
তারা নেই আজ সংসারের অভ্যন্তরে,
তবু তাদের ছায়া জড়িয়ে আছে আমাদের চারদিকে,
তোমার নীরবতা তাদেরই ঘর করে।
তবু আজও যা বেঁচে আছে—এই ভগ্ন স্তম্ভের নিচে,
সে প্রেম নয়তো ছোট কিছু—
বিধাতা নিজ হাতে রেখেছেন বলে টিকে আছি,
এইটুকু উষ্ণতাই আজ আমাদের পাথেয়।
ভেবেছো কি একবার—
যদি তুমি থাকতে উচ্চকণ্ঠ, অবিচল, সত্যের পক্ষে—
তবে কি আজ এতটা ভাঙা হতাম আমি?
তবে কি এই সম্পর্কের গায়ে থাকত এতটা শূন্যতার ধ্বনি?
মূলভাব:
কবিতাটি সম্পর্কের ভাঙন ও একে অপরের মধ্যে অব্যক্ত কথা এবং নীরবতার কারণে ঘটে যাওয়া মানসিক যন্ত্রণার একটি প্রতিফলন। কবি সম্পর্কের প্রাথমিক দিকটি এমনভাবে বর্ণনা করেছেন যেখানে প্রেমের শুরুতেই ছিল ছায়া, ক্লান্তি, এবং অশান্তি। জীবন যে দীপ্তিময় হতে পারত, তা ভুল সিদ্ধান্তের কারণে ভেঙে যায়। খরস্রোতা নদী যেমন স্নেহ জানে না, ঠিক তেমনি সম্পর্ক যদি বিশ্বাসের উপর না দাঁড়িয়ে থাকে, তা একসময় ধ্বংস হয়।
কবিতায় বলা হয়েছে, প্রেম একটি বৃক্ষের মতো যা শক্ত হয় বিশ্বাসে, তবে যদি সেই বিশ্বাসে ফাটল ধরে, তাহলে সম্পর্ক ধ্বংস হয়ে যায়। নীরবতা এমন এক বিষাক্ত উপাদান, যা সম্পর্ককে ধ্বংস করে দেয়। কবিতাটি বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সম্পর্কের মধ্যে যদি কথা না থাকে, তাহলে তা একটি দুঃখজনক পরিণতি ঘটায়।
তুমি চুপ ছিলে—এই বাক্যটির মাধ্যমে কবি সেই মুহূর্তটি চিত্রিত করেছেন যখন অন্যরা সম্পর্কের মধ্যে বিষ প্রয়োগ করেছিল, আর সেই নীরবতা সম্পর্কের মধ্যে গভীর ক্ষতির জন্ম দেয়। তবে, সব কিছু সত্ত্বেও কবি এমন কিছু আশা বা ভালোবাসার রয়ে গেছে, যা এখনও তাদের জীবনে জীবিত রয়েছে, যদিও সেটি ভগ্ন স্তম্ভের মতো।
কবিতার মূল বক্তব্য হলো, নীরবতা ও অব্যক্ত কষ্ট সম্পর্কের ভাঙনের কারণ হতে পারে, কিন্তু সেই ভাঙনের মধ্যেও কিছু না কিছু প্রেম বা অনুভূতি বেঁচে থাকে।